Killer Toon ক্রাইম-থ্রিলার-হররের এক অসাধারণ মিশেল


আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কোনো না কোনো অন্ধকার অধ্যায় থাকে। কোনো এক দুর্বল মূহুর্ত, হঠাৎ জেগে ওঠা কোনো ঝোকের বশে বা উত্তেজনার পারদে ভেসে আমরা অনেকেই আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি।
নিজের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করার মাদকতায় ভুলে হয়ত অন্যের পথে বাধা হয়ে দাড়াই। নিজে ব্যার্থতার চোরাবালি থেকে উঠতে অন্যকে টেনে নামাই গভীর পাঁকে, আবার নিজের সাফল্যের একক ভাগ নিজেই ভোগ করার
চুড়ান্ত লোভে অন্যকে পাহাড় শীর্ষ থেকে আলতো ঘায়ে ফেলে দেই পাথুরে বধ্যভুমিতে। 
না, এর সবই যে আবার আমরা নিজের পশুত্বের বশবর্তী হয়ে করি তাও কিন্তু নয়। কখনোবা প্রকৃতির অবাক খেয়ালে নানা কাকতালীয় কার্যকরণে তা হয়ে যায়, কিন্তু সেখানেই হয়ত তা শেষ হয়ে যায় না।
দুর্ঘটনার পরবর্তী ফলের মিষ্ট স্বাদ আস্বাদনের লোভে আমরা আবার নিজেকে উৎসর্গ করি নিজেরই অন্ধকার স্বত্তার কাছে। দু হাত-দু পা ওয়ালা মানবরুপী পশুতে পরিণত হই আমরা। ক্ষণিকের মত নিজের বিবেক-বুদ্ধি, বিবেচনাবোধকে
স্বার্থের খাচায় আবদ্ধ করে রাখি। অপরাধের মধ্যেও খুজে পাই নিজের পক্ষের সাফাই, নিজেকেই হয়ত নিজেই সান্তনা দেই, “এ করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না।” 

When a gun triggers a bullet, Two person dies. One who was pointed to, another who triggers.

আসলেই তো, যখন কোনো ঘটনা ঘটে, তখন হয়ত সেই ঘটনা মহাকালের অসীম গর্ভে বিলীন হয়ে যায় কিন্তু সেই কর্মের কর্তা তো বর্তমানই থাকেন। একসময় তিনি তার পশুরুপ থেকে মানবরুপে ফিরে আসেন, আর তখনই তার বিবেক হুংকার দিয়ে ওঠে। 
বিবেকের অরণীতে পুড়ে পুড়ে নিজেরই কৃতকর্মের ফল যেন নিজের অন্তর্ঘাতের মাধ্যমেই ভোগ করতে থাকে। যে জীবন সাজাতে অন্যের জীবনের রফাদফা করা হয়েছিল, সেই জীবনও ধংসস্তুপে পরিণত হয় তার কার্যকরণে।
কিন্তু আমরা তা চাইনা, আমরা চাই আমাদের অন্ধকার অধ্যায়কে রঙিন আলোর ঝলকানিতে ঢেকে রাখতে, আমরা চাই তা ভুলে থাকতে যেন আদৌ কখনো তেমন কিছু ঘটেই নি। ভুলে থাকাই যেন পাপমুক্তির একমাত্র কার্যকরী উপায়। 
কিন্তু কেমন হবে যদি সেই পাপ তার আপণ স্বরুপ ধরে আপনার সামনে এসে দাড়াই? সে যদি একই প্রতিদান চেয়ে বসে তখন?

আমাদের জীবনের চরম গোপনীয় সব অনুগল্প আর তাদের দান-প্রতিদানের মহাকাব্য নিয়ে নির্মীত কোরিয়ান হরর মুভি Killer Toon (2013)



ক্যাং জি-উন একজন বিখ্যাত কমিক-লেখক। তার গত Web-Comic চরম সফলতা পায় এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর তিনি আরেকটি কমিক লিখেন। কমিকটির পান্ডুলিপিটি শেষ করে তিনি তা প্রকাশকের কাছে পাঠিয়ে দেন।
কিন্তু বিপত্তি বাধে এখানেই, সে রাতেই প্রকাশক তার অফিসে মারা যান। পুলিশ তার মৃতদেহ হুবহু সেই কমিকের এক চরিত্রের মৃতদেহের মত অবস্থায় পায়। পুলিশ প্রথমে আত্মহত্যা মনে করলেও ঠিক নিশ্চিত হতে পারে না।
এদিকে এর কদিন পরেই আরেকটি খুন হয়, এবারো হুবহু সেই কমিকের সাথে মিলে যাচ্ছে। অর্থাৎ যেন সেই কমিকটিই বাস্তবে মঞ্চায়িত হচ্ছে……পুলিশ হন্যে হয়ে এর কিনারা খোজে, অন্যদিকে ক্যাং খোজে তার এই রহস্যময় কমিক গল্পের মধ্যে নিহীত রহস্য।
এই কমিকটি আসলে কি? কেই বা খুন করছে এভাবে? এটা কি ভৌতিক কোনো ব্যাপার? নাকি সবই বুজরুকি?
এশিয়ান হররের একটা কমন বিষয় আছে, সেটা হল এর কাহিনী প্রথমে খুব ধীর ভাবে আগায়, আস্তে আস্তে ঘোরালো হতে থাকে। মুভির চরিত্র গুলো একে অন্যের সাথে প্রথমে তেমন সম্পর্ক না থাকলেও আস্তে আস্তে তাদের মধ্যকার জটিল সম্পর্ক বের হয় আর হররটি শেষ পর্যন্ত সাইকোলজিক্যাল জগাখিছুড়িতে পরিণত হয়। 
তবে কিলার টুন মোটেও সেরকম নয়। এর কাহিনী প্রথম দৃশ্য থেকেই চলেছে রকেট বেগে। মুভি অন করার সাথে সাথেই আপনি সেটে যাবেন মনিটরের পর্দায়। কতকগুলো হরিফিক খুনের দৃশ্য আর তার মোহিত সিনেমাটোগ্রাফি আপনাকে চেয়ারের সাথে সুপারগ্লু আঠা দিয়ে আটকিয়ে রাখবে।
পুরো মুভি দেখার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে ফেলবেন এটুকু দেখেই, কিন্তু না। এর পরই মুভিতে টগবগে থ্রিলারের জায়গা দখল করে নেবে জমাটবাধা সাসপেন্স আর ঘোরালো কাহিনী। পুলিশ অফিসার কি-চুলের সাথে মিলে আপনি খুজবেন ঘটনার ব্যাখ্যাযোগ্য স্বাভাবিক সমাধান,
আর ক্যাং এর সাথে মিলে খুজবেন তার এই অলৌকিক কমিকের রহস্য। কখনো নিজেরই সত্ত্বার মধ্য ঘটবে সংঘর্ষ, আর, যখন কাহিনীর মূল স্রোত ধরে ফেলবেন তখন অদ্ভুত এক অনুভূতি হবে যা নিজে আস্বাদন করাই ভাল 

মুভিতে মূল চরিত্র মাত্র তিনটি, কমিক লেখকের ভুমিকায় সি-ইয়ং লি। মেয়েটাকে বড্ড ভালো লেগেছে আমার অভিনয়ও ভালোই করে। বেশ কিছু ড্রামা সিরিজেও কাজ করেছে মেয়েটা। নাহ, কে-ড্রামা থেকে আমি যতটা সম্ভব দুরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করি, কিন্তু কিছুদিন পরপর একেকজন সুন্দরী এসে আমার সব প্রতিজ্ঞা ধুলোয় মিশিয়ে দেয়, যত্তোসব 
সাথে পুলিশ অফিসার আর তার সহযোগীর চরিত্রে ছিলেন কি-জুন উম এবং ইয়ন-উ কিম। কি বিদঘুটে নাম রে বাবা। 
কোরিয়ান মুভিতে পুলিশদের দেখে আমি শুধু ভাবি, ‘এরা কি সত্যিই এমন ভাবে তদন্ত চালায়?” যেন কোনো সিরিয়াসনেস নেই এদের মাঝে।

মুভিতে হরর আর মিস্ট্রির মিশেলটা দারুন লেগেছে। কিছু কিছু দৃশ্যের উপস্থাপনটা মুগ্ধ করেছে। নিজে একজন কমিকপ্রেমী হওয়ায় প্লটটাও অসাধারণ লেগেছে। বলা যায় tale of two sisters আর whispering corridors এর পর আমার দেখা শ্রেষ্ঠ কোরিয়ান হরর।
কি চান আপনি এই মুভিতে? সিরিয়াল কিলিং চান? পাবেন। ক্রাইম থ্রিলার চান? সেটাতো ভরপুর পাবেন। হরর চান? সেটা আপনাকে মুভির প্রথমেই অভারডোজ দিয়ে দেয়া হবে। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার চান? তাইলে আর চিন্তা নেই, মুভি শেষ করে আমি ভাবতে বসেছিলাম এই মুভির গুঢ় তাৎপর্য। মানুষের মানুষিক দিক দিয়ে কত গভীরে হেসেখেলে এই
মুভির প্লট চলে গিয়েছে তা আপনি মুভি দেখলেই বুঝবেন। বলা যায় না, আপনার জীবনেও যদি তেমন কোনো কিছু থাকে তাহলে মুভির শেষে গিয়ে আপনিও নিশ্চুপ হয়ে হারিয়ে যাবেন চিন্তার জগতে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ